বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার চার্জিং অবকাঠামোয় সম্ভাবনার আলো জ্বালাচ্ছে স্টার্টআপ ‘ক্র্যাক প্লাটুন’

চার্জিং অবকাঠামোয় সম্ভাবনার আলো জ্বালাচ্ছে স্টার্টআপ ‘ক্র্যাক প্লাটুন’

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে দ্রুতগতিতে বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার। তবে বাংলাদেশে এই খাতে অগ্রগতি এখনো তুলনামূলক ধীর। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির উচ্চ মূল্য ও চার্জিং অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাই এর প্রধান কারণ। এই বাস্তবতায় বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং সুবিধাকে ব্যবসায়িক সম্ভাবনায় রূপ দিতে কাজ শুরু করেছে দেশীয় স্টার্টআপ ক্র্যাক প্লাটুন চার্জিং সলিউশন লিমিটেড

১৭ স্থানে ৩০ চার্জিং স্টেশন

বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ক্র্যাক প্লাটুন ইতোমধ্যে দেশের ১৭টি স্থানে মোট ৩০টি চার্জিং স্টেশন চালু করেছে। এসব স্টেশনে একসঙ্গে প্রায় ৫০টি বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।
ঢাকা ছাড়াও কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাজশাহী, বগুড়া ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি র‍্যানকন মোটরস, ডিএইচএস মোটরস ও র‍্যানকন ব্রিটিশ মোটরসের সঙ্গে যৌথভাবে এ অবকাঠামো গড়ে তুলছে। এসব প্রকল্পে এরই মধ্যে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে সারা দেশে প্রায় ২০০টি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের চুক্তি রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু স্বপ্নের যাত্রা

ক্র্যাক প্লাটুনের গল্পের শুরু রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) থেকে। ২০১৫ সালে সহশিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কয়েকজন শিক্ষার্থী গড়ে তোলেন অটোমোবাইল দল ‘টিম ক্র্যাক প্লাটুন’
এই দলের সদস্য ছিলেন ফারহান খলিল, মো. তানভীর শাহরিয়ার, মো. মুসা মাহমুদ রানা ও আবু মুছাইব খান।

২০১৭ ও ২০১৯ সালে দলটি জাপানের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ‘ফর্মুলা স্টুডেন্ট জাপান’-এ অংশ নেয়। ২০১৯ সালে স্থানীয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের জন্য বিশেষ সম্মাননাও অর্জন করে তারা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে চাকরির পাশাপাশি চার তরুণ মিলে ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেন ক্র্যাক প্লাটুন চার্জিং সলিউশন লিমিটেড

সরকারি তহবিল ও বিনিয়োগ

চার্জিং স্টেশনের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার নিয়ে গবেষণার পর প্রতিষ্ঠানটি স্টার্টআপ বাংলাদেশ থেকে ১০ লাখ টাকা সরকারি বিনিয়োগ পায়। পরে কোম্পানির নিবন্ধন সম্পন্ন করে উদ্যোক্তারা পুরোপুরি ব্যবসায় মনোযোগ দেন।

২০২৩ সালে স্টার্টআপটি ৩০ লাখ টাকার অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট পায় এবং উদ্যোক্তারা নিজেরাও ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় করা হয় নিজস্ব ক্লাউডভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ও মোবাইল অ্যাপ উন্নয়নে।

‘চার্জ ইজি’ অ্যাপ

ক্র্যাক প্লাটুনের তৈরি মোবাইল অ্যাপ ‘চার্জ ইজি’ ব্যবহার করে গ্রাহকরা জানতে পারবেন—

  • কোথায় চার্জিং স্টেশন খালি আছে

  • প্রি-বুকিং সুবিধা

  • স্মার্ট নেভিগেশন

  • বিকাশ, নগদ ও কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট

লাভের পথে স্টার্টআপ

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে। ক্র্যাক প্লাটুনে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে ২৩ জনের। উদ্যোক্তারা জানান, দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসার গতি আরও বাড়বে। চলতি বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি মুনাফায় আসবে বলে তারা আশাবাদী।

জ্বালানি সাশ্রয়ে বড় সম্ভাবনা

ক্র্যাক প্লাটুনের ব্যবসা উন্নয়নবিষয়ক পরিচালক মো. মুসা মাহমুদ রানা বলেন,
দেশে আমদানি করা পেট্রোলিয়ামের প্রায় ৫৪ শতাংশ ব্যবহৃত হয় অটোমোবাইল খাতে। প্রচলিত গাড়ির ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা যেখানে ৩০–৩৫ শতাংশ, সেখানে বৈদ্যুতিক গাড়ির কার্যক্ষমতা ৮০–৯২ শতাংশ।
প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি গাড়ির খরচ ৮–১০ টাকা হলেও বৈদ্যুতিক গাড়িতে খরচ হয় মাত্র ২ টাকা।

বাসা ও বাণিজ্যিক চার্জিং সুবিধা

প্রতিষ্ঠানটি বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক উভয় পর্যায়েই চার্জিং স্টেশন স্থাপন করছে।

  • বাসায় চার্জিং স্টেশন: ১–৩ লাখ টাকা

  • বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশন: ৪০–৮০ লাখ টাকা

বর্তমানে র‍্যাডিসন ব্লু, দুসাই রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টসহ বেশ কয়েকটি অভিজাত হোটেলে মার্সিডিজ বেঞ্জের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে।

ভবিষ্যতের পরিকল্পনা

ক্র্যাক প্লাটুনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তানভীর শাহরিয়ার জানান,
“আমাদের লক্ষ্য শুধু ব্যবসা নয়, দেশের পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থায় অবদান রাখা। ২০২৭ সালের মধ্যে সারা দেশে ২০০ চার্জিং স্টেশন স্থাপন করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার আরও সহজ করা আমাদের মূল লক্ষ্য।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *