মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছিলেন তানিয়া নাসরিন। যে বয়সে স্কুলজীবন ও স্বপ্ন গড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই সংসারের ভার এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। পড়াশোনা অসম্পূর্ণ রেখে অল্প বয়সেই মা হন দুই সন্তানের। একসময় চরম আর্থিক সংকটে পড়লেও হার মানেননি তিনি। ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা বাড়িয়ে আজ তিনি একজন সফল ডিজিটাল ডিজাইনার ও ফ্রিল্যান্সার। বর্তমানে তাঁর মাসিক আয় এক হাজার ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা।
তানিয়া নাসরিনের জন্ম ঢাকার দোহার উপজেলায়। বাবা আবদুল খালেক ছিলেন একজন প্রবাসী, মা রাশেদা বেগম গৃহিণী। ২০০১ সালে বাবার ক্যানসার ধরা পড়লে পরিবারের ওপর নেমে আসে চরম সংকট। সেই পরিস্থিতিতেই সামাজিক চাপে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তানিয়ার বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের দেড় মাস পরই বাবা মারা যান। অল্প বয়সে বাবাহারা হয়ে সংসারের দায়িত্ব নিতে হয় তাঁকে।
২০০২ সালে তাঁর প্রথম সন্তান জেবা ফারিহার জন্ম হয়। এরপর সংসার ও সন্তান লালন-পালনের কারণে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সালে দ্বিতীয় সন্তান জুবায়ের আহম্মেদের জন্মের পর নতুন করে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন তানিয়া। সিদ্ধান্ত নেন আবার পড়াশোনা শুরু করবেন। স্বামীর বাড়ি ঢাকার লালবাগ এলাকায় হওয়ায় তিনি স্থানীয় একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। পরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন এবং শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজ থেকে বিবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
সংসারের অভাব-অনটনের সময় ঘরে বসে আয়ের পথ খুঁজতে গিয়ে গ্রাফিক ডিজাইনের সঙ্গে পরিচিত হন তানিয়া। ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে গ্রাফিক ডিজাইনের প্রশিক্ষণ নেন। শুরুতে কঠিন সময় পার করলেও প্রশিক্ষকদের সহায়তায় ধীরে ধীরে দক্ষতা অর্জন করেন। মেধা ও আগ্রহের কারণে তিনি অ্যাডভান্সড গ্রাফিক ডিজাইন কোর্সে শতভাগ বৃত্তি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে শিক্ষানবিশ হিসেবেও কাজ করার সুযোগ পান।
গ্রাফিক ডিজাইনের পাশাপাশি তিনি মোশন ডিজাইন ও ইউআই/ইউএক্স ডিজাইনেও দক্ষতা অর্জন করেন। বর্তমানে অ্যাডোবি স্টক, শাটারস্টক ও ফাইভারসহ আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে নিয়মিত কাজ করছেন তিনি। প্যাসিভ ও অ্যাক্টিভ আয়ের সমন্বয়ে তাঁর মাসিক আয় এখন হাজার ডলারের বেশি।
তানিয়া নাসরিন বলেন, “বিয়ে হয়ে যাওয়া মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর সঠিক গাইডলাইন থাকলে ঘরের কোণ থেকেও বিশ্বজয় করা সম্ভব।” তিনি ভবিষ্যতে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে কাজ করতে চান।
