গ্রামে ফিরে প্রযুক্তির আলো জ্বালালেন আফিফুর রহমান

গ্রামে ফিরে প্রযুক্তির আলো জ্বালালেন আফিফুর রহমান

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার ষোলহাসিয়া গ্রামের শান্ত পরিবেশে গড়ে উঠেছে এক ভিন্নধর্মী প্রযুক্তি শিক্ষা উদ্যোগ। গ্রামের তরুণদের হাতে–কলমে তথ্যপ্রযুক্তির দীক্ষা দিচ্ছেন কম্পিউটারবিজ্ঞানে স্নাতক আফিফুর রহমান। যেখানে দেশজুড়ে দক্ষ তরুণদের বড় শহর কিংবা বিদেশে ঝোঁক বেড়েই চলেছে, ঠিক সেখানে নিজের অর্জিত জ্ঞান ফের নিজের সমাজের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গ্রামের পথই বেছে নিয়েছেন তিনি।

ফিরে আসার গল্প

ঢাকার আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এআইইউবি) থেকে স্নাতক শেষে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার স্বপ্ন ছিল আফিফুরের। তবে পরিবারের একমাত্র সন্তান হওয়ায় বাবা-মায়ের আপত্তিতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়। দেশে থেকেই ক্যারিয়ার গড়ার পরিকল্পনায় চট্টগ্রামের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পেলেও তাতেও যাননি। বরং যোগ দিলেন ময়মনসিংহের ক্যাপিটাল কলেজে।

পরবর্তীতে ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে ঢাকায় দুটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘসময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখে দেখা দেয় ‘ড্রাই আই সিনড্রোম’। চিকিৎসকের পরামর্শে ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন আফিফুর। এর পর শুরু হয় অনিশ্চয়তার দিন। কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রেও চেষ্টা করেও সন্তুষ্টি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেন নিজের গ্রামে।

গ্রামের তরুণদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত

গ্রামে ফিরে প্রথমে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা বাড়লেও দ্রুতই বুঝতে পারেন, সময়টা কাজে লাগানো দরকার। বন্ধুদের পরামর্শে তিনজন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু করেন প্রাইভেট পড়ানো। এখান থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর প্রযুক্তি–শিক্ষার যাত্রার সূচনা।

একদিন জানতে পারেন, কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়মিত দেরিতে আসে কারণ তারা স্থানীয় একটি সাইবার ক্যাফেতে ‘কম্পিউটার শেখে’। সেখানে কী শেখানো হয়—জিজ্ঞেস করলে জানা গেল, কেবল বাংলা–ইংরেজি টাইপিং আর সামান্য ওয়ার্ড ফাইল তৈরি করা। টাইপিং স্পিড মাপার ধারণাও নেই। আফিফুর তখনই বুঝে যান—এ অঞ্চলে আধুনিক কম্পিউটার শিক্ষার চরম অভাব।

কোরডেফট: গ্রামে গড়ে ওঠা আধুনিক আইসিটি শিক্ষা কেন্দ্র

২০২০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কোরডেফট আইসিটি প্রাইভেট প্রোগ্রাম এবং কোরডেফট কম্পিউটার ট্রেনিং ইনস্টিটিউট—গ্রামাঞ্চলে মানসম্মত কম্পিউটার শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে।
এখানে শেখানো হয়—

  • উচ্চমাধ্যমিক স্তরের আইসিটি

  • ৩ ও ৬ মাস মেয়াদি ‘কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন’ কোর্স

  • ৩ মাস মেয়াদি গ্রাফিক ডিজাইন কোর্স

  • হাতে–কলমে প্রযুক্তি ব্যবহার

শিক্ষাদানে ব্যবহার করা হয় প্রজেক্টর, প্রেজেন্টেশন এবং বাস্তব উপকরণ। মাদারবোর্ড শেখাতে তিনি সত্যিকারের মাদারবোর্ড সামনে এনে প্রতিটি অংশ দেখান—যা গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা।

এর ফলও মিলেছে দ্রুত। ২০২৫ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় তাঁর কোচিংয়ের ১০০% শিক্ষার্থী আইসিটি বিষয়ে পাস করেছে

শিক্ষার্থীদের জীবনে পরিবর্তন

কোরডেফট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকেই কাজ পেয়েছেন দেশে ও বিদেশে। মালয়েশিয়ায় কর্মরত এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী এখন অন্যদের তুলনায় মাসে ২৫ হাজার টাকা বেশি আয় করছেন।
অন্যদিকে গার্মেন্টসে কর্মরত তালহা জানান, কেবল ভালোভাবে কম্পিউটার শিখেছেন বলেই সহকর্মীদের তুলনায় ৬ হাজার টাকা বেশি বেতন পাচ্ছেন।

বর্তমানে—

  • প্রাইভেট প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী: ১২০ জন

  • কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারের শিক্ষার্থী: ৯২ জন

  • মাসিক মোট আয়: প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা

গ্রামের ছেলেটির উদ্যোগ এখন অনেকের জীবনে আলোর পথ দেখাচ্ছে।

ভাষা–শিক্ষার পরিকল্পনা: আরেকটি স্বপ্ন

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আজিজুর রহমান ও শিক্ষক আঞ্জুমান আরার বড় ছেলে আফিফুর এখন নিজের পরিবার নিয়েও ব্যস্ত। স্ত্রী খাতুন জান্নাত ও ছেলে আহনাফ আল আদিয়ান তাঁর অনুপ্রেরণা।

আগামী দিনের পরিকল্পনা জানতে চাইলে আফিফুর বলেন,
“প্রযুক্তির পাশাপাশি ভাষা শেখাও এখন জরুরি। ভবিষ্যতে একটি ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং ইনস্টিটিউট গড়তে চাই। স্পোকেন ইংলিশ ও বিদেশগামী শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেব।”

তিনি বিশ্বাস করেন—
প্রযুক্তি ও ভাষা—দুটি দক্ষতা অর্জন করতে পারলে বাংলাদেশের তরুণরা বিদেশে আরও বেশি আয় করতে পারবে এবং দেশকে সমৃদ্ধ করতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *